যেভাবে ছড়িয়েছে হানাফি মাযহাব

মূলঃ আব্দুর রাহমান বিন ইয়াহিয়া আল মু’আল্লিমী

ভাষান্তরঃ আবু হিশাম মুহাম্মাদ ফুয়াদ

পাঠপূর্ব সতর্কীকরণ: এই লেখাটির অনুবাদ পরিবেশন করার দ্বারা জনমনে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। ইতিহাসের অলি-গলিতে চাপা পড়ে থাকা এই ইতিহাস সামনে নিয়ে আসার পিছনে আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে এ দ্বারা আমাদের সামাজিক ও মাযহাবি নানা গোঁড়ামির পিছনে কারণ ও সমাধান খোঁজা, সাথে সাথে মাযহাবি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পুঁজি করে সমাজে নিজেকে ও নিজ দলকে শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করার যে মানসিকতা তার সম্পর্কে পাঠকমনে চিন্তার উদ্রেক ঘটানো। দ্বীন নিয়ে বিদ্বেষ আমাদের অন্তরের রক্ত:ক্ষরণ ঘটায়। আমরা চাই দ্বীনি সঠিক বুঝযুক্ত এক বিদ্বেষহীন উম্মাহ! স্বাগত আপনাকে ইতিহাসের এ কঠোর অধ্যায়ে–

 

মূল লেখনী

[শাইখ আব্দুর রহমান বিন ইয়াহইয়া আল মু’আল্লিমি রহিমাহুল্লাহ মুহাম্মদ যাহিদ আলকাউসারি হানাফি কে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ]

আসলে আমরা আপনাদের মাযহাব ছড়িয়ে পড়বার ইতিহাস ভালো করেই জানি।

প্রথমত,

আপনাদের মাযহাবের প্রতি লোকদের অতিরিক্ত টান ছিলো। কারণঃ এটি তাদের হাদিস খোঁজা, তা শোনা ও মুখস্থ করা, তা নিয়ে গবেষণা করা এবং তার সানাদের প্রকাশ্য ও গোপন[‘ঈল্লাল] দোষত্রুটিগুলো বের করবার মতো ক্লান্তিকর কাজগুলো ছাড়ায় (দ্বীনি বা বৈষয়িক) নেতৃত্ব পেতে প্রলুব্ধ করতো। তারা দেখেছিলো এ কঠিন কাজগুলো ছাড়াই আরো সহজ পথে অর্থাৎ নিজ রায়ের উপর থেকে ও তাতে আমল করায় তার নেতৃত্ব পাবার জন্য যথেষ্ট!

দ্বিতীয়ত,

আপনাদের সঙ্গীরা[১] সেসময় ‘বিচারকদের বিচারক’[২] এর অবস্থানে ছিলেন। তখন তাঁরা মুসলিম ভুখন্ডের শহরগুলোতে তাদের নিজ মতাদর্শ অর্থাৎ হানাফি মতাদর্শের কাউকে ছাড়া অন্য মতাদর্শের কাউকে বিচারক হিসেবে নিযুক্ত না করার ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। আর লোকেরা বিচারকের পদ পেতে অতি আগ্রহী ছিলো। ফলে এই বিচারকেরা দেশজুড়ে (রাষ্ট্রীয়ভাবে-ব্যাপক পরিসরে) তাদের মাযহাব প্রচারে নিযুক্ত হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত,

‘মিনহাহ’[৩] আপনাদের দোসরদের হাতেই ছিলো। আল ম’মুন, আল মু’তাসিম, আল ওয়াথিক্ব এর খিলাফতেও তা জারি থাকে এবং তৎকালীন সমগ্র রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালিত হচ্ছিলো তাদের অর্থাৎ হানাফিদের ছত্রছায়ায়। ফলে তারা সকল এলাকায় ই’তিক্বাদ(বিশ্বাস) ও ফিক্বহে(বিধিবিধান সংক্রান্ত শাস্ত্রে) তাদের মাযহাব অনুপ্রবেশ করাতে তৎপর হয়ে পরে। আর ফিক্বহে যারাই তাদের বিরোধীতা করেছে তারা তাদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করেছেন ও তারা তাদের বিভিন্নভাবে ক্ষতি করবার চেষ্টা করেছেন। আর সে কারণেই তাদের কাছে হুমকি মনে হয়েছিলো শামের ‘আলিম, ফিক্বহুল আওযায়ীর উত্তরাধিকারী আবু মুশাহির ‘আব্দুল ‘আলা বিন মুশাহিরকে, ফিক্বহুল হাদিসের ঝান্ডাবাহী ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালকে, আশ শাফঈর উত্তরাধিকারী আবু ইয়াক্বুব আল বুয়ুতি এবং আবুল হাকামসহ মিসরের সকল মালিকিদের। ‘ক্বুদাত মিসর’ (মিসরের বিচারকমন্ডলী – মিসরের সে বিচারকগোষ্ঠী যারা ঠিক এমনটা করেছেন), এই গ্রন্থে কবি তার সময়ের বিচারকদের কাজগুলোকে প্রশংসার সুরে বলেছেন,
আমি জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিয়েছি এর ছাত্রদের কাছে,

“আর আমি এ থেকে বহিয়েছি ঝর্ণা, করিনি খেয়ানাত।

আবু হানিফার কথাকে হেদায়েতের ঢাল হিসেবে গ্রহণ করেছি,

এবং স্মরণীয় মুহাম্মদ ও ইউসুফের কথাকেও,

প্রত্যাখ্যান করে আবু লাইলার ফতোয়া এবং তাদের নেতাদের-কিয়াস।

এবং হাজ্জাজ ভাই এর কথার প্রতি দৃষ্টি দিয়ে,

শাফেয়ী এবং তার সংগীদের মত ধ্বংস করলাম,

ইবনে আলিয়ার কথাকেও ছাড় দিই নি।

বন্দি করেছি তাদের কথাকে জেলখানায়। ছাড় দিই নি আমি।

তুলে ধরেছি এই বন্দিদের –

যাতে করে তোমার কাছে তাদের ক্ষুদ্রতা স্পষ্ট হয়ে যায়।

এখন উল্লেখ করছি মালিকিদের কথা,

তাদেরকে এমনভাবে বিলীন করে দিয়েছি

যাতে তাদের কথা আর স্মরণ-ও না করে কেউ।”

এর পর মিশরে সে সময়ে ক্বুর’আন মাখলুক স্বীকার করানোর জন্য ‘আলেমদের উপর যে জোর-জবরদস্তি বা চাপ প্রয়োগ করা হয় কবি তার বর্ণনা দিয়েছেন। দেখুনঃ ক্বুদাত মিশর, পৃঃ ৪৫২।

চতুর্থত,

[হানাফি মাযহাব ছড়ানোর পিছনে রয়েছেঃ] রাষ্ট্রগুলোতে অত্যধিক পরিমাণে অনারবদের অবস্থান, জাতীয়তাবাদের ফলে তাদের মাঝে আপনাদের মাযহাবের প্রতি সৃষ্ট অন্ধ গোষ্ঠিতন্ত্র-গ্রুপবাজি, আর আপনাদের মাযহাবে বিভিন্ন বিষয়ে ছাড় ও কৌশলসমূহ।

পঞ্চমত,

অনারব রাষ্ট্রগুলোতেও এরকমই ঘটেছে। ফলে তাদের ব্যাপারও ঠিক সে রকমেরই।

আপনাদের দোসররা সর্বস্ব জোর দিয়ে এমন প্রচারণা করেছে যার কোন কিছুর সাথে তুলনা হয় না। এবং এরই জের ধরে তারা মিথ্যাকে বৈধ করতে থাকে এমনকি রাসুল ﷺ এর উপর হওয়া মিথ্যাকেও, যেমনটি আমরা ‘মানাক্বিব’[৪]-গুলোর মাঝে দেখতে পাই।

.

‘আব্দুর রহমান আল মু’আল্লিমি, আত তানকিল বি মাফি তা’নিবিল কাউসারি মিনাল আবাতিল (আলবানির তাহক্বীকসহ), ৪র্থ সংস্করণ, রিয়াদ, সৌদি আরব, মাকতাবাতুল মা’আরিফ লিন নাশ্‌র্‌ ওয়াত তাওযি’, ১৪৩১ হিজরি[২০১০ খ্রিঃ], খন্ডঃ১, পৃঃ ২৬০-২৬১।

 

পাদটীকা

[১] যাদের মাঝে প্রথম হলেন আবু ইউসুফ ইয়াকুব বিন ইবরাহীম আল আনসারি। ইনি ইমাম আবু হানিফা আল নু’মান বিন থাবিত বিন যুত্বা বিন মারযুবান, যাঁর দিকে বর্তমান হানাফি মাযহাবকে নিসবাত করা হয়, – এর অন্যতম সঙ্গী ছিলেন।

[২] (দ্বীনি অথবা বৈষয়িক) রায় প্রদান বা বিচার বিষয়ের বিশেষ অবস্থান যা প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় আব্বাসীয় খলিফাদের দ্বারা। এবং এ অবস্থানে প্রথম আসীন হন আবু ইউসুফ।

[৩] মিনহাহ হলো ইসলামি ইতিহাসের এমন এক সময় যে সময়ে ‘আলিমদের উপর নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় অনেক ‘আলিম কারাবন্দী ও নিপীড়িত হন যেমনঃ আহমাদ বিন হাম্বাল।

[৪] ‘মানাক্বিব’ এর শাব্দিক অর্থঃ গুণাবলি। হানাফি মাযহাবের গুণাবলি বর্ণিত ঐতিহাসিক কিতাবাদিকে মানাক্বিব বলা হয়। এই গ্রন্থগুলোতে রাসুলের থেকে অনেক জাল রেওয়ায়েত আনা হয়েছে নিজ মাযহাবের পক্ষে। আবার, ইমাম আবু হানিফাকে নিয়ে অনেক অতিরঞ্জিত বর্ণনাও আনা হয়েছে যেমনঃ আবু হানিফাহর মা-বাবারর বিবাহের অতিরঞ্জিত কাহিনী, চল্লিশ বছর যাবৎ ‘ইশা-র উদ্বুতে ফজর আদা’ করা বা এক রাক’আতে ক্বুরআন খতমের ঘটনা ইত্যাদি। আল্লাহর রাসুল ﷺ  নিঃসন্দেহে আবু হানিফা (রহঃ) এর চেয়ে অধিক আল্লাহভীরু ও ধার্মিক ছিলেন, তবুও তিনি ﷺ তিন দিনের কমে ক্বুর’আন খতম করতে বারণ করেছেন (তিরমিযি #২৯৪৯)। এবং ঘুম ছেড়ে সারারাত ইবাদত করতে চাওয়া এক ব্যক্তিকে তিনি ﷺ তাঁর সুন্নাহর বাইরে বলেছেন (মুসলিম #১৪০১)।

নোটঃ উপরোক্ত ছবিটি বর্তমান সময়ের মাযহাবের অনুসারীদের সঠিক পরিসংখ্যান প্রদর্শন করে না। যেমনঃ ভারত উপমহাদেশে বহু সংখ্যক গাইরু-হানাফি আহলুল-হাদিস[মালেক,শাফে’ঈ ও আহমাদের মাযহাবের সমন্বিত অনুসারী-মূলত বিনা দ্বীধায় ক্বুর’আন সুন্নাহর অনুসারী] রয়েছেন, যারা ইমাম আবু হানিফার দিকে রুজু নন। এছাড়াও এটি কোনভাবেই ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে মাযহাবের অনুসারীদের সঠিক বিন্যাস নয়। ফারসি রাজত্ব(বর্তমান ইরান), মিশর, শাম, খোরাসান, ভারত প্রভৃতি রাষ্ট্রেও অনেক আহলুল হাদিস ছিলেন বিদেশি ও ঔপনিবেশিক শক্তির হস্তক্ষেপের পূর্বপর্যন্ত যেমন আমরা দেখি ইরানের সাফাউইদরা জোরপূর্বক তাদের ধর্মে বা মতাদর্শে লোকদের দাখিল করাতো, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে আব্বাসীয় ও উথমানীয় খিলাফত ও ভারতের মোহাম্মাদ গোন্দালওয়ী। আবার এই ছবিটি ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য দেশগুলো যেগুলোতে মুসলিমরা সংখ্যালঘু, সেসব দেশের মুসলিমদের অবস্থাও তুলে ধরে না। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুনঃ রিহলাতু ইবনু যুবাইর।

নোট ২ : শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানি অঘোষিতভাবেই তার টীকাগুলোতে এ কথাগুলোকে সমর্থন করেছেন।।

স্বত্বাধিকারী © www.darhadith.com

Share This Post