জান্নাত প্রত্যাশীর একটি দিন: (সারা দিনের কর্মনির্ঘণ্ট)

সময়গুলো ক্রমেই অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। একসময় আমাদের জীবন সন্ধ্যা নেমে আসবে। এই ভরা যৌবনের সব রঙ, রস ও গন্ধ মুছে যাবে। কিন্তু তারপরও কি আমাদের অলসতা ও গাফলতির ঘুম ভেঙ্গেছে? আমরা কি সচেতন হয়েছি? পেরেছি কি আখিরাতে জন্য পর্যাপ্ত পাথেয় সংগ্রহ করতে?

উত্তর, অবশ্যই না। ঈমান ও আমলের দুর্বলতা আমাদেরকে গ্রাস করে নিয়েছে। দুনিয়ার রূপ-লাবণ্যে আমরা মুগ্ধ ও পাগলপারা। এভাবেই চলতে চলতে হঠাৎ একদিন সময়ের গতি থেমে যাবে। মৃত্যু দূত আমাদেরকে নির্দিষ্ট সময়ে তুলে তুলে নিয়ে যাবে আমাদের রবের কাছে। তাই এখনই আমাদের সচেতন হওয়া অপরিহার্য।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. বলেন: আমি এমন দিনের উপর অনুশোচনা করি যেই দিনের সূর্য ডুবে গেছে, আমার জীবন থেকে একটি দিন কমে গেছে অথচ তাতে আমার আমল বৃদ্ধি পায় নি।”
সত্যিই মানুষের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত কিন্তু কাজের পরিধি অনেক বেশি। তাই আখিরাতের চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করতে হলে এই সীমিত সময়কে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো আবশ্যক। তাহলে আল্লাহর রহমতে এ অল্প সময়ে বিশাল কল্যাণ অর্জন করা সম্ভব-যার মাধ্যমে আমরা জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে চীর সুখের নীড় জান্নাতে প্রবেশ করার মাধ্যমে জীবনের অভীষ্ট লক্ষে পৌঁছতে পারব বলে আশা করি।
তাই একজন জান্নাত প্রত্যাশী ঈমানদার ব্যক্তির জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বয়ে সারা দিনের ইবাদত-বন্দেগীর একটি প্রস্তাবিত কর্মনির্ঘণ্ট ও কর্মসূচী পেশ করা হল। কেউ এটি অনুসরণ করলে আশা করা যায়, জান্নাতের পথে চলা তার জন্য অনেক সহজ হবে ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এটি অনুসরণ করার তাওফিক করুন। আমীন।

 ক. রাতে ঘুমাতে যাওয়া থেকে নিয়ে ফজর পর্যন্ত:

১) ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে তাহাজ্জুদের সালাত এবং নফল রোযা রাখার নিয়ত করা।
২) আগেভাগে ঘুমিয়ে পড়া।
৩) ঘুমানের পূর্বে ওযু করা, দুআ ও যিকিরগুলো পাঠ করা। অত:পর ঘুমের আদবগুলোর প্রতি খেয়াল রেখে ঘুমিয়ে যাওয়া।
৪) ফজরের প্রায় আধাঘণ্টা পূর্বে ঘুম থেকে উঠে- ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার দুআগুলো পাঠ করা। অত:পর মিসওয়াক করার পর ওযু করা বা প্রয়োজন হলে গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করা।
৫) তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা। (দু রাকআত দু রাকআত করে ৮ রাকআত পড়া। অত:পর বিতর সালাত আদায় করা)
৬) নফল রোযা রাখার নিয়তে সেহরি খাওয়া।
বি:দ্র: নফল রোযা রাখার শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হল, এক দিন পর এক দিন রোযা রাখা। তা সম্ভব না হলে, সপ্তাহে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার- দু দিন, তাও সম্ভব না হলে আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ, তাও সম্ভব না হলে মাসের যে কোন দিন তিনটি রোযা রাখা। তিনটি রোযার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা সারা মাস রোযা রাখা সওয়াব দান করবেন।

 খ. ফজরের পর থেকে নিয়ে সূর্যোদয় পর্যন্ত:

৭) ফজরের আযান হলে আযানের জবাব দেয়া।
৮) ঘরে ফজরের দু রাকআত সুন্নত আদায় করা।
৯) অত:পর মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার দুআ পাঠ করা এবং মসজিদে যাওয়ার মর্যাদা ও ফযিলত মনের মধ্যে জাগ্রত রেখে আগেভাগে মসজিদে যাওয়া।
১০) মসজিদে প্রবেশের দুআ পাঠ করত: ডান পা আগে রেখে মসজিদে প্রবেশ করা এবং যথাসম্ভব ১ম কাতারে ঈমামের ডানপাশে সালাতের জন্য অবস্থান নেয়া।
১১) ঘরে ফজরের সুন্নত না পড়ে থাকলে মসজিদে তা আদায় করা। অন্যথায় বসার পূর্বে দু রাকআত তাহিয়াতুল মসজিদ (দুখুলুল মসজিদ) আদায় করা।
১২) অত:পর কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, ইস্তিগফার, দুআ ইত্যাদি পাঠরত অবস্থায় ফজরের ফরয সালাতের অপেক্ষা করা।
১৩) ফজরের সালাতের ইকামত হলে তাকবীরে তাহরিমা সহকারে অত্যন্ত ভয়-ভীতি, বিনয়, নম্রতা ও একাগ্রতার সাথে ফজরের সালাত শেষ করা।
১৪) সালাত শেষ করার পর যথাস্থানে বসা অবস্থায় সালাত পরবর্তী দুআ ও যিকিরগুলো পাঠ করা। অত:পর সেখানে বসেই সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত সকালের আযকার সহ বিভিন্ন ধরণের দুআ, যিকির, তাসবীহ, তাহলীল, ইস্তিগফার কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি ইবাদতে লিপ্ত থাকা।
১৫) সূর্য উদিত হওয়ার ১৫/২০ মিনিট পর দু রাকআত সালাতুল ইশরাক আদায় করা। (এভাবে করলে একটি পূর্ণ হজ্জ ও উমরার সওয়াব অর্জিত হয় আল হামদুলিল্লাহ)
১৬) অত:পর আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দেয়া জীবিকা উপার্জন এবং তার নির্দেশের আলোকে দিন কাটানোর নিয়তে মসজিদ থেকে বের হওয়া। বের হওয়ার সময় মসজিদ থেকে বের হওয়ার দুআ পাঠ করত: বাম পা আগে রেখে মসজিদ থেকে বের হওয়া।

 গ. সূর্য উদিত হওয়ার পর থেকে নিয়ে সারাদিন:

এরপর দুনিয়াবি কাজ-কারবার করার পাশাপাশি সাধ্যানুযায়ী আল্লাহ ইবাদত-বন্দেগী করা।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দেশনা নিম্নরূপ:

১৭) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাসময়ে জামায়াতের সাথে আদায় করা। মহিলারা তাদের ঘরে যথাসময়ে আওয়াল ওয়াক্তে (সালাতের ১ম সময়ে) সালাত আদায় করবে। আর পুরুষরা মসজিদে গিয়ে তাকবীরে তাহরিমা সহকারে ১ম কাতারে সালাত আদায় করবে।
১৮) ফরয সালাতের আগে-পরের সুন্নতগুলো গুরুত্ব সহকারে আদায় করা।
১৯) যোহর সালাতের প্রায় এক বা দেড় ঘণ্টা পূর্বে সালাতুয যোহা (চাশত/আওয়াবীন) এর সালাত আদায় করা।
এর পরিমাণ হল, সর্ব নিম্ন ২ রাকআত। তবে দু রাকআত দু রাকআত করে ৮ রাকআত পড়া অধিক উত্তম।
২০) সারা দিনে কমপক্ষে এক পারা কুরআন তিলাওয়াতের চেষ্টা করা (এতে এক মাসে এক খতম হবে ইনশাআল্লাহ)।
সেই সাথে কুরআনের কিছু অংশের তরজমা ও তাফসীর পড়া।
২১) আমলের নিয়তে কমপক্ষে ২/৩ টা হাদিস পাঠ করা। এ ক্ষেত্রে ঈমান, আমল, তাকওয়া, ইখলাস ইত্যাদি বৃদ্ধির জন্য রিয়াযুস সালেহীন এবং সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থদ্বয় অধিক উপযোগী। তবে ইচ্ছা ও আগ্রহের ভিত্তিতে অন্যান্য হাদিসগুলোও (যেমন সহীহুল বুখারী, মুসলিম ইত্যাদি) পাঠ করা যেতে পারে।
২২) কিছু আর্থিক দান করা বা কোন গরিব মানুষকে খাবার খাওয়ানো। (পরিমাণে অল্প হলেও নিয়মিত অব্যাহত রাখা আল্লাহর নিকট খুবই পছন্দনীয় আমল)
২৩) কোনও রোগী দেখতে যাওয়া।
২৪) কোথাও মৃত ব্যক্তির জানাযা হলে তাতে অংশ গ্রহণ করা এবং দাফন প্রক্রিয়ায় শরিক হওয়া।
২৫) নিকটাত্মীয় বা দীনী ভাই ও বন্ধুদের সাথে দেখা করা এবং তাদের খোঁজ-খবর নেয়া। (সহীহ হাদিসে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি একদিনে উপরোক্ত চারটি কাজ করলে মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন)
২৬) একাকী বা কাউকে সঙ্গে নিয়ে কবর যিয়ারত করতে যাওয়া। (একই কবরস্থান প্রতিদিন নিয়ম করে যিয়ারত করা ঠিক নয় বরং মাঝে-মধ্যে করা যেতে পারে)
২৭) লোকজনের মাঝে দাওয়াতি কাজ করা। এলাকার বেনামাযী ও গাফেল লোকদেরকে দ্বীনের পথে আহ্বান করা, অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি কাজ করা, কাউকে পাপকর্ম বা শরিয়ত বিরোধী কাজ করতে দেখলে শক্তি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকলে তাতে বাধা দেয়া, তা সম্ভব না হলে মুখে নিষেধ করা। তাও সম্ভব না হলে উক্ত অন্যায় ও পাপকর্মকে অন্তরে ঘৃণা করা। এটি ন্যূনতম ঈমানের চিহ্ন।
২৮) মানুষের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে উত্তম চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো। যেমন: হাসিমুখে লোকদের সাথে দেখা করা, সালাম বিনিময় করা, সুন্দর ও মিষ্টি ভাষায় কথা বলা, বিনয় ও ভদ্রতা সুলভ আচরণ করা, মানুষের উপকারে অগ্রগামী থাকা, দ্বীনের কাজে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করা ইত্যাদি।
২৯) অলসতা পরিত্যাগ করে জীবিকা উপার্জনে কষ্ট পরিশ্রম করা, পিতামাতার সেবা করা, স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে সুন্দর ও অভিভাবক সুলভ আচরণ করা এবং তাদেরকে দীনী তরবিয়ত (দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান দান করে তার উপর চলার জন্য প্রশিক্ষণ) দেয়া।

 ঘ. সন্ধ্যা থেকে নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত:

৩০) আসর সালাতের পর থেকে নিয়ে সূর্যাস্তের মধ্যে সন্ধ্যার দুআ ও যিকিরগুলো পাঠ করা।
৩১) কোনও মসজিদে আলেমদের দরস/আলোচনা থাকলে বা কোথাও ভালো কোন আলেমের ওয়ায/বক্তৃতা থাকলে তা শুনতে যাওয়া অথবা কোন হক্কানি সুন্নতের অনুসারী আলেমের নিকট ইলম শিক্ষা ও দীনী বিষয়ে জানার জন্য গমন করা। অন্যথায় মোবাইল মেমরী বা ইন্টারনেট থেকে নির্ভরযোগ্য বড় আলেমদের আলোচনা শোনা।
৩২) নফল রোযা থাকলে সূর্য ডুবার পর ইফতার করা। তারপর মাগরিব সালাতের জন্য মসজিদে গমন করা এবং মাগরিবের আযান ও সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে দু রাকআত নফল পড়ার চেষ্টা করা যদি সুযোগ থাকে। (যদিও অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে, আমাদের সমাজের অধিকাংশ মসজিদে এ সুযোগ নাই)
৩৩) মাগরিব ও ইশার সালাতের মধ্যবর্তী সময় কিছু নফল সালাত আদায় করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সময়টকুকুকে মানুষ অবহেলায় কাটিয়ে দেয় বলে নফল সালাত আদায়ে উৎসাহিত করেছেন।
৩৪) দীনী জ্ঞানার্জনের জন্য নির্ভরযোগ্য ও ভালো আলেমদের লিখিত বই-পুস্তক পাঠ করা।
৩৫) সারা দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে আত্ম সমালোচনা করা এবং ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর নিকট তওবা-ইস্তিগফার করা।
৩৬) অত:পর ইশার সালাতের পর একান্ত দরকার না হলে বা স্ত্রীর সাথে সময় কাটানো ছাড়া দুনিয়াবি কথা না বলে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সময়ে বরকত দান করুন এবং দিনরাতের পুরোটা সময়কে উপকারী ও সৎকর্মে অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, KSA

Share This Post